Spirituality

ধর্মের নামকরণ: সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা নাকি মানবীয় সিদ্ধান্ত?

January 31, 2026
3 min read
Share
ধর্মের নামকরণ: সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা নাকি মানবীয় সিদ্ধান্ত? - Article by G.K.M. Jarif Ur Rahim, Founder of Rashik - The Awakening

ধর্মের নামকরণ: সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা নাকি মানবীয় সিদ্ধান্ত?

একটি তুলনামূলক ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ


সৃষ্টিকর্তা যদি একজনই হন, তাহলে পৃথিবীতে এত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের নাম কেন? এই প্রশ্নটি হয়তো অনেকের মনেই উঁকি দিয়েছে। আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব — বিভিন্ন ধর্মের নামকরণ কি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এসেছে, নাকি এটি মানুষের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ফল?

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন এবং সত্য অনুসন্ধান — কোনো ধর্ম বা ধর্মাবলম্বীকে ছোট করা নয়।


মূল প্রশ্ন

ধর্মীয় গ্রন্থগুলো পৃথিবীতে আসার পর সৃষ্টিকর্তা নিজে কি কোথাও ধর্মের নাম উল্লেখ করেছেন? নাকি মানুষ গ্রন্থগুলো পাওয়ার পর নিজেদের মতো করে ধর্মের নাম নির্ধারণ করেছে?

যদি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর প্রেরিত গ্রন্থগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নাম না পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে ধর্মের নামকরণ মানুষের সৃষ্টি। আসুন, প্রধান ধর্মগুলোর গ্রন্থ পর্যালোচনা করে দেখি।


১. ইসলাম

ধর্মগ্রন্থ: কুরআন — যা সৃষ্টিকর্তার সরাসরি বাণী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়।

ধর্মের নাম: "ইসলাম"

কুরআনে সৃষ্টিকর্তা সরাসরি ধর্মের নাম উল্লেখ করেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম ইসলাম।"
— সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৯

"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, এবং আমার নিয়ামত তোমাদের উপর পূর্ণ করেছি এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে মনোনীত করেছি।"
— সূরা মায়িদা, আয়াত ৩

বিশেষত্ব: ইসলাম এমন একটি ধর্ম যেখানে ধর্মের নাম সরাসরি ধর্মগ্রন্থে সৃষ্টিকর্তার বাণী হিসেবে উল্লেখিত।


২. খ্রিস্টধর্ম (Christianity)

ধর্মগ্রন্থ: বাইবেল (ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্ট)

ধর্মের নাম: "Christianity" বা "খ্রিস্টধর্ম"

বাইবেলের মূল গ্রন্থে সরাসরি "Christianity" শব্দটি নেই। "খ্রিস্টান" (Christian) শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় আন্তিওক শহরে যিশুর অনুসারীদের বর্ণনা করতে:

"...এবং প্রথমবার আন্তিওকে যিশুর অনুসারীদের খ্রিস্টান বলা হয়।"
— প্রেরিতদের কাজ, ১১:২৬

বিশেষত্ব: ধর্মের নামটি সৃষ্টিকর্তার সরাসরি নির্দেশনা নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হয়েছে।


৩. ইহুদিধর্ম (Judaism)

ধর্মগ্রন্থ: তৌরাত (Torah), তানাখ

ধর্মের নাম: "Judaism" বা "ইহুদিধর্ম"

তৌরাত বা তানাখে সরাসরি "Judaism" শব্দটি নেই। এই নাম এসেছে "যিহুদা" (Judah) গোত্রের নাম থেকে, যা ইসরায়েলি গোত্রগুলোর একটি। তানাখে ইহুদিদের জন্য "ইস্রায়েলের সন্তান" (Children of Israel) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষত্ব: ধর্মের নাম সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সরাসরি উল্লেখিত নয় — এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ফল।


৪. হিন্দু ধর্ম (Sanatana Dharma)

ধর্মগ্রন্থ: বেদ, উপনিষদ, পুরাণ

ধর্মের নাম: "সনাতন ধর্ম" বা "হিন্দু ধর্ম"

বেদ বা উপনিষদে "হিন্দু" বা "সনাতন ধর্ম" শব্দের সরাসরি উল্লেখ নেই। "সনাতন ধর্ম" শব্দটি পরবর্তীতে ব্যাখ্যাকারীদের দ্বারা প্রবর্তিত, যা শাশ্বত সত্যের প্রতীক। "হিন্দু" নামটি ভৌগোলিক কারণে এসেছে — সিন্ধু নদীর অঞ্চলের মানুষদের বোঝাতে।

বিশেষত্ব: ধর্মের নাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ফল।


৫. বৌদ্ধধর্ম (Buddhism)

ধর্মগ্রন্থ: ত্রিপিটক

ধর্মের নাম: "Buddhism" বা "বৌদ্ধধর্ম"

ত্রিপিটকে "Buddhism" নাম নেই। এই নাম এসেছে গৌতম বুদ্ধের অনুসারীদের দ্বারা। বুদ্ধ নিজেকে শিক্ষাদাতা এবং "ধর্ম" (Dhamma) প্রচারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশেষত্ব: ধর্মের নাম ঐতিহাসিকভাবে অনুসারীদের মাধ্যমে এসেছে।


৬. শিখধর্ম (Sikhism)

ধর্মগ্রন্থ: গুরু গ্রন্থ সাহিব

ধর্মের নাম: "Sikhism" বা "শিখধর্ম"

গুরু গ্রন্থ সাহিবে "Sikhism" শব্দটি নেই। "শিখ" শব্দের অর্থ "শিক্ষার্থী"। ধর্মের নাম এসেছে গুরু নানকের শিক্ষার অনুসরণ থেকে।

বিশেষত্ব: ধর্মের নাম গুরুদের শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।


উপসংহার: একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে:

ইসলাম একমাত্র ধর্ম যেখানে ধর্মের নাম সরাসরি ধর্মগ্রন্থে সৃষ্টিকর্তার বাণী হিসেবে উল্লেখিত আছে। কুরআনে "ইসলাম" নামটি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত।

অন্যান্য প্রধান ধর্মগুলোর নাম — খ্রিস্টধর্ম, ইহুদিধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, শিখধর্ম — এগুলো ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক বা অনুসারীদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, ধর্মগ্রন্থে সৃষ্টিকর্তার সরাসরি নির্দেশনা হিসেবে নয়।

এই তথ্যটি আমাদের চিন্তার খোরাক দেয় এবং সত্য অনুসন্ধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।


প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, সত্য অনুসন্ধানের এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক।

If you found this article valuable, share it with your network:

Share

Want to Discuss This Topic?

Book a consultation to explore these ideas further and apply them to your journey.